Home / কেরিয়ার / জব ট্রেন্ড / টেলি কোম্পানি করতে চাইলে | টেলিকমে ক্যারিয়ার (শেষ পর্ব)
টেলি কোম্পানি করতে চাইলে টেলিকমে ক্যারিয়ার শেষ পর্ব

টেলি কোম্পানি করতে চাইলে | টেলিকমে ক্যারিয়ার (শেষ পর্ব)

নিজেরও হতে পারে টেলি কম্পানি

দেশে প্রতিনিয়তই গড়ে উঠছে বিভিন্ন টেলি কম্পানি। এই সেক্টর সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, আত্মবিশ্বাস, মানসিক ধৈর্য এবং বেশ বড় রকমের মূলধন বিনিয়োগ করে গড়ে তুলতে পারেন গ্রামীণফোন, বাংলালিংকের মতো একটি টেলি কম্পানি। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দরকার সঠিকভাবে বিনিয়োগ, যোগ্য লোক বেছে নেয়া এবং সঠিক বাজারজাত পরিকল্পনা।

সাধারণত একটি টেলি কম্পানি গড়ে তুলতে হলে নিন্মলিখিত বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবেঃ

১. বেসরকারি টেলি কম্পানি হিসেবে কাজ করতে চাইলে প্রথমেই আইনগত বৈধতা অর্জন করতে হবে। বাংলাদেশে টেলিফোন কম্পানিগুলোর গঠনগত আইনী বৈধতার জন্য বিধিবদ্ধ সংস্থা হলো Joint Stock Company। কম্পানির নিজস্ব গঠনতন্ত্র, কম্পানিটি কি Private নাকি Limited, ব্যবসার ধরণ, ব্যবসার সাথে সরাসরি পণ্য আমদানীর বিষয় থাকলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে Joint Stock Company – এর নিজস্ব ফরমে রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন করতে হবে। কম্পানির প্রচলিত নিজস্ব নিয়ম – নীতির পদ্ধতিগত পরিমাপের আলোকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনগত বৈধতা প্রদান করে থাকে।

২. Joint Stock Company – এর কাছ থেকে প্রাপ্ত আইনগত বৈধতা এবং ব্যবসা শুরু করার সনদপত্র, কম্পানির পরিচালনা পর্ষদের প্রত্যেক সদস্যের ব্যক্তিগত TIN নাম্বার, পাসপোর্ট সাইজ রঙ্গিন ছবি এবং কম্পানির নিজস্ব গঠনতন্ত্র এর সত্যায়িত ফটোকপি জমা দিয়ে ব্যাংক এর নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করে কম্পানির নামে ব্যাংক একাউন্ট খুলতে হবে।

৩. Joint Stock Company – এর কাছ থেকে কম্পানির আইনগত বৈধতা পাওয়ার পর ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্ধ, কলচার্জ নির্ধারণ এবং নেটওয়ার্ক স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ টেলিকম রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) এর কাছে নির্ধারিত ফি প্রদান করে আবেদন করতে হবে।

৪. বিটিআরসি’র অনুমোদন পাওয়া গেলেই কেবল টেলি কম্পানি প্রতিষ্ঠা করা যাবে।

৫. প্রত্যেকটি থানায় কাস্টমার সার্ভিস সেন্টার স্থাপন করতে হবে। যাতে সহজেই ক্রেতা এবং গ্রাহকদের সেবা প্রদান করা যায়।

৬. বিভিন্ন দেশী এবং বিদেশী টেলি কম্পানির সাথে সুসম্পর্ক রাখতে হবে। এর ফলে ব্যবসা পরিচালনা করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও পরামর্শ পাওয়া যাবে।

৭. সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট সংযোগসহ একাধিক অত্যাধুনিক কম্পিউটার, প্রিন্টার, স্ক্যানারসহ উন্নত প্রযুক্তির সকল সুবিধা অফিসে রাখতে হবে।

৮. কম্পানির নিজস্ব একটি পরিচালনা পর্ষদ থাকতে হবে।

৯. টেলি কম্পানিগুলোকে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। এজন্য কমপক্ষে নগদ ৫০০ থেকে ২০০০ কোটি টাকার মূলধন থাকতে হবে। এছাড়াও বিভিন্ন ব্যাংক কিংবা ঋন প্রদানকারী সংস্থাগুলোর সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে হবে যাতে প্রয়োজনে সহজেই ঋণ নেয়া যায়।

১০. সিটি করপোরেশন থেকে ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হবে।

১১. গ্রাহকদের ২৪ ঘন্টা সেবা প্রদান করার জন্য কল সেন্টার স্থাপন করতে হবে।

১২. ক্রেতা যাতে সহজেই কম্পানির সিমকার্ড, প্যাকেজ, মোবাইল ফোন সেট, প্রিপেইড কার্ড সংগ্রহ করতে পারেন সেজন্য প্রতিটি থানায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডিলার, এজেন্ট নিয়োগ দিতে হবে।

নতুন একটি কম্পানি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করাটাও জরুরিঃ

১. প্রতিটি কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হবে বিভাগ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা, মেধা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং সৃজনশীলতা বিবেচনা করে।

২. যেহেতু টেলি কম্পানির প্রত্যেকটি কাজ একটি নির্দিষ্ট টার্গেট অনুযায়ী করা হয়, তাই সকল কাজ ডেডলাইনের আগেই শেষ করতে হবে।

৩. কম্পানি আইন এবং টেলিকমিউনিকেশন আইনসমূহ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে।

৪. কাজ ও সেবার মান সন্তোষজনক হতে হবে। অন্যথায় প্রতিষ্ঠিত টেলি কম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা টিকে থাকা কঠিন হবে।

৫. কমিটমেন্ট ঠিক রাখতে হবে। কারণ যিনি একটি সংযোগ, মোবাইল ফোন সেট অথবা প্যাকেজ কিনছেন, তিনি কম্পানির সেবার সন্তুষ্ট হলে ভবিষ্যতে পরিচিতদেরকেও এই কম্পানির সংযোগ, মোবাইল ফোন সেট অথবা প্যাকেজ কিনতে পরামর্শ দিবেন।

৬. ভালো লোকেশনে জমি কিনে অথবা ভাড়া নিয়ে নেটওয়ার্ক, কাস্টমার সার্ভিস সেন্টার এবং শাখা অফিস স্থাপন করতে হবে। জমি কেনা বা ভাড়া নেয়ার সময় কি ধরণের কাজে এই জমি ব্যবহার করলে কম্পানির লাভ হবে সে বিষয়টি প্রথমেই ভেবে নিতে হবে।

৭. প্রতিনিয়ত নতুন নতুন আইডিয়া ডেভলপ করতে হবে। কেননা প্রতিযোগিতামূলক বর্তমান বিশ্বে নতুন কিছু প্রদর্শন করতে না পারলে ব্যবসায় টিকে থাকা কষ্টকর হবে।

৮. কলরেট, সংযোগমূল্য, প্যাকেজ, ইন্টারনেট, এসএমএস চার্জসহ অন্যান্য ভ্যালু এ্যাডেড সার্ভিস চার্জ এবং মোবাইল ফোন সেটের মূল্য যতটুকু সম্ভব কম রাখতে হবে। এর ফলে যেমনিভাবে গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, ঠিক তেমনিভাবে ব্যবহার বেশি হওয়ায় কম্পানির আয় বৃদ্ধি পাবে।

৯. শীর্ষস্থানীয় পত্র-পত্রিকা, রেডিও ও টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন প্রদানের পাশাপাশি বিলবোর্ড, ব্যানার, লিফলেট ইত্যাদির মাধ্যমে কম্পানির প্রচারের জন্য অবশ্যই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।

১০. আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার পাশাপাশি গ্রাহকদের স্বল্পমূল্যে আরও কি ধরনের সেবা দেয়া যায় সে বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করতে হবে।

১১. এলাকা ও ক্রেতার চাহিদাভেদে সেন্টার দিতে হবে।

১২. স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, বাংলা নববর্ষ, ঈদ এর মতো সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে কম্পানির পক্ষ থেকে সাংস্কৃতিক কিংবা সেবামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলে তা সহজেই গ্রাহকদের আকৃষ্ট করবে। একইসাথে কম্পানির প্রচারেও তা সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

১৩. জমি কেনা, ভারা নেওয়ার ক্ষেত্রে জমির মাপ, মাটির অবস্থা বিবেচনা করতে হবে। প্রাথমিকভাবে জায়গা পছন্দ হলে জমির কাগজপত্র পরীক্ষার জন্য লিগ্যাল অ্যাডভাইজারকে দিতে হবে। জমির মালিকানা একাধিক হলে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি অবশ্যই থাকতে হবে। অর্থাৎ জমির সকল অংশীদারের সমর্থন থাকতে হবে। জমি কেনার আগে জমির রাজস্ব, মিউনিসিপ্যাল ট্যাক্স, ভ্যাট ইত্যাদি পরিশোধ করা আছে কি না সেদিকটি অবশ্যই দেখে নিতে হবে। প্রয়োজনে জমি কেনার আগে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে হবে, যাতে পরবর্তীতে কেউ জমির মালিকানা দাবী করে সমস্যা সৃষ্টি করতে না পারে।

১৪. কলরেটসহ প্রতিটি প্যাকেজ বাজারে ছাড়ার আগে অবশ্যই বিটিআরসি’র অনুমোদন নিতে হবে। বিটিআরসির নীতি বর্হিভূত কর্মকান্ড কোনো অবস্থাতেই করা যাবে না।

গ্রামীণফোনের সেলস একাউন্ট ম্যানেজার আসাদুল্লাহ আফজাল আহমেদ-এর মতে, কেউ যদি শুধুমাত্র কোনো টেলি কম্পানির পণ্য সামগ্রী বিক্রয় করে টেলিকমিউনিকেশন সেক্টরে ভূমিকা রাখতে চান সেক্ষেত্রে তার নিম্মলিখিত বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে-

• শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে যেখানে যাতায়াতের সুযোগ-সুবিধা বেশি এমন স্থানে কমপক্ষে ২০০-৫০০ বর্গফুট এর একটি অফিস কিংবা দোকান থাকতে হবে।

• সিটি করপোরেশন অথবা পৌরসভা থেকে ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হবে।

• নিজস্ব ব্যাংক একাউন্ট থাকতে হবে।

• ব্যাংক সলভেন্সি (আর্থিক স্বচ্ছলতা) সার্টিফিকেট থাকতে হবে।

• ডিলারশীপ কিংবা এজেন্ট হবার জন্য কমপক্ষে নগদ এক লক্ষ থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা জামানত প্রদানের আর্থিক সামর্থ্য থাকতে হবে।

• কম্পানির সুযোগ, প্রিপেইড কার্ড, হ্যান্ডসেট, প্যাকেজ সংগ্রহ করে তা ক্রেতাদের কাছে বিক্রয় করার মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল এবং আর্থিক সামর্থ্য থাকতে হবে। আর এসব থাকলেই যে কোনো টেলি কম্পানির পণ্যসামগ্রী বিক্রয় করার অনুমতি পাবেন।

দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি টেলি কম্পানিঃ

• গ্রামীণফোন লিমিটেড

সেলিব্রেশন পয়েন্ট, রোড-১১৩/এ, প্লট-৩ ও ৫,
গুলশান-২, ঢাকা-১২১২।
ফোন : ৯৮৮২৯৯০, ৯৮৮৫২৬১
ওয়েব : www.grameebphone.com

• টিএম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (একটেল)
ব্র্যাক সেন্টার (১০ম তলা), ৭৫ মহাখালী
ঢাকা-১২১২। ফোন : ৯৮৮৫২৩২, ৯৮৮৭১১৩, ০১৮১৯৪০০৪০০।
ওয়েব : www.aktel.com

• সেবা টেলিকম লিমিটেড (বাংলালিংক)
টাইগারস ডিন, প্লট-৪ এসডব্লিউ (এইচ)
গুলশান এভিনিউ, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২।
ফোন : ৯৮৮৮৩৭০-১, ৯৮৬২৩২৪।
ওয়েব : www.banglalinksm.com

• টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড
বাড়ি-৪১, রোড-২৭, ব্লক-এ, বনানী, ঢাকা-১২১৩। ফোন : ৯৮৮২৫৮৫, ০১৫৫০১৫৬০৫১, ০১৫৫৬৪০৮০৪০।
ওয়েব : www.teletalk.com.bd

পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ

টেলি কমিউনিকেশন ব্যবসায় বর্তমানে মার্কেটিং এবং সেলস ডিপার্টমেন্টে প্রচুর সংখ্যক এমবিএ ডিগ্রিধারীদেরকে নিয়োগ দেয়া হয় বলে, বর্তমানে এমবিএ নিয়ে পড়াশোনা করার আগ্রহ সবার মাঝেই একটু বেশি।

বর্তমানে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ, বিবিএ করার সুযোগ আছে। কিন্তু আমাদের দেশে শুধুমাত্র টেলিকমিউনিকেশন সেক্টরেই যারা কাজ করতে চান তাদেরকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেবার মতো প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অত্যন্ত কম। এ ব্যাপারে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং বিটিআরসি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এমনটিই টেলিকমিউনিকেশন সেক্টরে যারা ক্যারিয়ার গড়তে চান তারা সকলে প্রত্যাশা করছেন।

বাংলাদেশের পাবলিক বা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুধুমাত্র টেলিকমিউনিকেশনভিত্তিক কোনো আলাদা কোর্স এখানে চালু হয়নি। তবে কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান টেলিকমিউনিকেশন বিষয়ে স্নাতক এবং ডিপ্লোমা কোর্স চালু করেছে। এছাড়া উত্তর আমেরিকা, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভারত, মালয়েশিয়া, জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে টেলিকমিউনিকেশন সেক্টরে ক্যারিয়ার গড়া সহজ হবে।

About Muhammad Faisal

Muhammad Faisal
একরাশ স্বপ্ন মুঠোয় করে হাটছি অবিরাম..........

Check Also

টেলিকমিউনিকেশনের বর্তমান প্রেক্ষাপট টেলিকমে ক্যারিয়ার ২য় পর্ব

টেলিকমিউনিকেশনের বর্তমান প্রেক্ষাপট | টেলিকমে ক্যারিয়ার (২য় পর্ব)

বর্তমান প্রেক্ষাপট দেশে যত ব্যাপকহারে মোবাইল ফোনের বিস্তার ঘটেছে তত দ্রুত আর কোনো প্রযুক্তি বিস্তৃত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *