Home / ফিচার / পরামর্শ / নতুন চাকরিতে মানিয়ে নিতে
নতুন চাকরিতে মানিয়ে নিতে

নতুন চাকরিতে মানিয়ে নিতে

বহুজাতিক সংস্কৃতির মিলনকেন্দ্র কর্মক্ষেত্রে মানিয়ে নিতে সহকর্মীদের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার  বিকল্প নেই। সেই সাথে কর্মস্থলে নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতনতাও জরুরি। লিখেছেন – ফরহাদ হোসেন বিপু

হাসান মাহমুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ শেষ করে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেছিলেন। এরপর চাকরি নিলেন একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সিনিয়র মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে। কাজের চাপ, বসের সাথে মনোমালিন্য হওয়ায় দু’মাস পর সেখান থেকে অব্যাহতি নিলেন। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই দেখা গেল তিনি মোট ৩ বার চাকরি পরিবর্তন করেছেন।

হাসান সাহেব একটি প্রতিকী চরিত্র হলেও এরকম ঘটনা আমাদের আশেপাশে বিরল নয়। এভাবে চাকরি পরিবর্তন প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। সুতরাং চাকরিজীবী হিসেবে নতুন কর্মস্থলে মানিয়ে নিতে আপনাকে কয়েকটি কৌশল রপ্ত করতে হবে।

চাকরি নির্বাচনে সতর্ক থাকুন

কথায় বলে, ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না। পেশাজীবনে প্রবেশের পরেই আপনার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্ট হোন। আপনি কোন ক্ষেত্রে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন, কোন কাজে আপনার সৃজনশীলতা রয়েছে, কোন কাজে আপনি সফল হবেন ইত্যাদি প্রশ্নগুলো উত্তর প্রথমেই অর্থাৎ চাকরিতে ঢোকার পূর্বেই জেনে নিন। ফলে আপনার ইচ্ছে আর অনিচ্ছার দ্বন্দ্বের প্রশ্ন রইবে না। দ্বন্দ্ব না থাকলে চাকরি ছাড়া কিংবা মানিয়ে নেয়ার বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা নিন।

নতুন কর্মক্ষেত্র, নতুন দায়িত্ব

নতুন চাকিরেতে যোগ দিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে কিছু দায়িত্ব পালন করতে হবে। আপনি যে কাজের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন সেটি সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ভালোভাবে জেনে নিন। প্রয়োজনে সহকর্মীদের সাথে কাজের বাস্তবতা এবং তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে সুবিধা – অসুবিধাগুলো জেনে নিন। প্রতিষ্ঠানে কে কীভাবে কাজ করছে তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। অফিসের কাজের পরিবেশ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখুন।

আত্মবিশ্বাসী হোন

যে কোনো কাজের জন্য আত্মবিশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ। আত্মবিশ্বাস আপনাকে পরিবর্তিত নতুন পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে সহায়তা করবে। আপনি যে প্রতিষ্ঠানেই কাজ করুন না কেন সেখানকার পরিবেশের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখুন। নিজেকে এভাবে বলুন, আমি জেনেশুনে এখানে চাকরি নিয়েছি, আমি অবশ্যই এখানে সফল হবো এবং ভালোভাবেই দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদন করতে পারবো।

আপনি যদি প্রতিনিয়ত হতাশায় ভোগেন, কোনো কাজ করতে গিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন, নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা বা জ্ঞানের উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে না পারেন তাহলে আপনার কাজে ব্যর্থতা পরিলক্ষিত হবে। নিজের মানসিক অবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানের চাপে আপনি এক সময় কাজে অব্যাহতি নিতে চাইবেন। তাই চাকরিতে মানিয়ে নেতে হলে আত্মবিশ্বাস জরুরি।

সময়ে অর্পিত দায়িত্ব শেষ করুন

সব প্রতিষ্ঠানের এবং সব কাজের একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। প্রথমেই সেই নিয়মগুলো ভালোভাবে জেনে নিন। অতঃপর সে অনুযায়ী কাজ করুন। সময়মতো কাজ করতে পারলে আপনি কাজে আনন্দ পাবেন, প্রতিষ্ঠান আপনার প্রতি সন্তুষ্ঠ থাকবে এবং কাজগুলোও পরিকল্পিতভাবে দ্রুত সম্পন্ন হবে। কাজে ধারাবহিকতা আসবে। আপনি নিজের সময় বুঝে কাজ করতে চাইলে প্রতিষ্ঠান আপনাকে দিয়ে আশানুরূপ ফল পাবে না। ফলে আপনাকে চাকরি থেকে অব্যহতি দেয়ার জন্য প্রতিষ্ঠান উৎসাহিত হবে।

তাই সময় এবং দায়িত্ব সম্পর্কে আপনাকে সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে। দায়িত্ব অবহেলা বা খামখেয়ালিপনা এবং সময় অপচয় প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর। তাই প্রতিষ্ঠান কখনও এ বিষয়ে আপনাকে ছাড় দিবে না। সঠিক সময়ে সঠিক নিয়মে কাজ করলে আপনি নিজেও সহজেই কাজের সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলতে পারবেন।

লক্ষ্য করুন

  • কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পূর্বেই পেশা সম্পর্কে স্থির সিদ্ধান্তে আসুন।
  • নিজের আগ্রহ ও দক্ষতা আছে এমন পেশা গ্রহণে সচেষ্ট হোন।
  • কর্মক্ষেত্রের শর্তসমূহ সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নিন।
  • আত্মবিশ্বাসী হোন। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বিপদের কারণ হতে পারে। এক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ বজায় রাখুন।
  • ব্যক্তিজীবন ও পেশা জীবন আলাদা রাখতে চেষ্টা করুন। এই দুইটি ক্ষেত্রকে কখনই একসাথে মিলিয়ে ফেলবেন না।
  • অতিরিক্ত আবেগ বর্জন করুন।
  • সহকর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলুন।
  • ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে সুসম্পর্ক সৃষ্টি করুন, কিন্তু এক্ষেত্রে চাটুকারিতার মনোভাব পরিহার করুন।
  • অর্পিত দায়িত্ব সঠিক সময়ে যথাযথভাবে পালন করতে চেষ্টা করুন।
  • কর্মক্ষেত্রের প্রতিকূল অবস্থাগুলোকে বুদ্ধিমত্তার সাথে ইতিবাচকভাবে সমাধানের চেষ্টা করুন।
  • সর্বোপরি নিজের কাজকে ভালোবাসুন।

স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজে অংশ নিন

সবকিছুর প্রতি নেতিবাচক ধারণা এবং হতাশা যে কোনো কাজে ব্যর্থতার নিয়ামক। তাই যখন যে কাজ করবেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই কাজে মনোনিবেশ করুন। আপনি যদি প্রতিনিয়ত চিন্তা করেন যে এই কাজ বিরক্তিকর, আপনার জন্য এই কাজ করা অসহ্য, চাপে পড়ে আমাকে এই কাজ করতে হচ্ছে ইত্যাদি। তাহলে আপনি কখনই কোনো চাকরিতে মানিয়ে নিতে পারবেন না।

কাজের মধ্যে আপনাকে আনন্দ খুঁজে পেতে হবে, স্বতঃস্ফূর্ত মনোভাব বজায় রাখতে হবে। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজে অংশগ্রহণ করলে আপনি খুব দ্রুতই কর্মস্থলের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেন।

উদ্যোগী হোন

বিশ্বে এ পর্যন্ত যারা খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেছেন তাদের প্রত্যেকেই উদ্যোগী মনোভাব নিয়ে কাজ করেছেন। সৃজনশীল মানসিকতা ও উদ্যোগী মনোভাব নিয়ে কাজ করলে কাজে বৈচিত্র‌্য আসবে, কাজের প্রতি আন্তরিকতা তৈরি হবে যা আপনাকে একটি বিশেষ স্থানে পৌছে দিবে। আপনি সহজেই প্রতিষ্ঠানের সাথে একাত্ন হয়ে আপনার পদমর্যাদার উন্নতি করতে পারবেন। আপনার উদ্যোগী মনোভাবের কারণে সহকর্মীদের কাছে আপনার মূল্যায়ন বাড়বে, আপনি সহজেই সহকর্মী, প্রতিষ্ঠানিক পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেন।

কর্তৃপক্ষের মন যুগিয়ে চলুন

একটি প্রতিষ্ঠানে সাফল্যের সাথে দীর্ঘদিন কাজ করতে হলে আপনাকে অবশ্যই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাহিদা ও মানসিকতা বুঝে কাজ করতে হবে। নতুন চাকরিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে হলে নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে দক্ষ ও কৌশলী হতে হবে। তারা আপনার কাছে কী চাইছে, কীভাবে কাজ করলে তারা সন্তুষ্ট থাকবে ইত্যাদি বিষয়গুলো আপনাকে জানতে হবে এবং সে অনুযায়ী কাজ করে আপনাকে সামনে অগ্রসর হতে হবে।

সহকর্মীদের সাথে আন্তরিক হোন

প্রতিষ্ঠানে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে, অধঃস্তনদের সাথে, সহকর্মীদের সাথে কোনোরকম দ্বিধা – দ্বন্দ্বের অবকাশ থাকলে বিষয়টি এড়িয়ে চলুন। ভালো ব্যবহার, আন্তরিকতা, পারস্পরিক আলোচনা, সমঝোতা ইত্যাদির মাধ্যমে সময়ের সাথে মানিয়ে চলার চেষ্টা করুন। আপনি যাদের সাথে সারাদিন কাজ করবেন অর্থাৎ সহকর্মী যারা তাদের সাথে আন্তরিক সম্পর্কে গড়ে তোলা এবং অব্যাহত রাখা গুরুত্বপূর্ণ। সহকর্মীদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠলে আপনি কাজে আনন্দ পাবেন এবং আপনার কার্য ক্ষেত্রে অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হবে।

অতিরিক্ত দায়িত্ব নিবেন না

নতুন চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার পর অনেকেই প্রথম দিকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কাজ করার চেষ্টা করেন। এতে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। অফিসে জোরালো অবদান রাখার পূর্বে নিজের অবস্থান দৃঢ় করে নিন। অল্প সময়ে মাত্রাতিরিক্ত অর্জনের চেয়ে প্রাথমিক দায়িত্বগুলো ভালোভাবে শেষ করার চেষ্টা করুন।

অফিসে যেহেতু আপনি নতুন সুতরাং কোনো বিষয়েই সবজান্তার ভাব দেখাবেন না। কারণ আপনি যেভাবে বিষয়টি জানেন সেখানে কাজ সেভাবে নাও হতে পারে। সুতরাং সব কাজেই আগ্রহ দেখান, আর পুরনো বিষয়গুলো নতুন করে শিখতে দোষের কিছু নেই। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে ‘Self – help is the best help’ বুঝতেই পারছেন আপনার পরিবর্তনে আপনি নিজেই যথেষ্ট। তাই এখন থেকেই কর্মক্ষেত্রে নয় নিজেকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বদলে ফেলুন।

About Parves Ahmed

Parves Ahmed
অনুকরণ নয়, অনুসরণ নয়, নিজেকে খুঁজে চলেছি, নিজেকে জানার চেষ্টা করছি, নিজের পথে হেটে চলছি॥

Check Also

প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ ১২ ঘন্টা পড়তে হবে

প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ – ১২ ঘন্টা পড়তে হবে

বাণিজ্য বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পাওয়া যতটা সহজ, এইচএসসিতে ততটা সহজ নয়। তাই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *