Home / অন্যান্য / ভ্রমন / নৌবিহারে গোলাপের সাম্রাজ্যে
নৌবিহারে গোলাপের সাম্রাজ্যে

নৌবিহারে গোলাপের সাম্রাজ্যে

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ কর্মদিবসের প্রতিদিনই যাওয়া-আসা চলে। রুটিন কাজ। ক্লাসের প্রস্তুতি নেয়া, ক্লাস নেয়া আর যাতায়াত। যান্ত্রিকতায় ভরা ধরাবাঁধা নাগরিক জীবন। গা সওয়া হয়ে গেছে এ জীবনের সাথে। জীবিকার প্রয়োজনে যারা একঘেঁয়ে ক্লান্তিকর জীবনকে মেনে নিতে বাধ্য হয়, আমি তাদের একজন। তবে সেদিনের সেই বিকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি সময়টুকু আমিসহ মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আটজন শিক্ষকের কাছে ধরা দিয়েছিল ভিন্নরকম সুখের আবেশ নিয়ে।

বরাবরের মতোই ক্লাস শেষে বাসযোগে ফিরছিলাম সবাই। আইন বিভাগের শিক্ষক আবদুল্লাহ হিল গণি স্যার বিরুলিয়া ব্রিজের কাছাকাছি আসতেই বলেন, চলুন স্যারেরা, সবাই মিলে নৌবিহারে যাই। সময় আর স্থানটাই এমন, ভাবাভাবির সময়টুকু খুব একটা ছিল না। বাসটি নবাবের বাগ আসতেই যে যার মতো নেমে পড়লাম। ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’- সৃষ্টির বৈচিত্র্য অনুসন্ধান আর চিত্তের বিনোদনের জন্য আমরা হারিয়ে যেতে চাইলাম ক্ষণিকের তরে।

‘বহুদিন ধরে বহু পথ ঘুরে বহু ব্যয় করে বহুদেশ ঘুরে, দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু, দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হৈতে শুধু দুপা ফেলিয়া একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশির বিন্দু।’

দীর্ঘ ছয়মাস ধরে একটানা একই পথে যাতায়াত। তবুও আমরা শিক্ষানবিশ ভ্রমণকারি। বেশ কয়েকটি বড় বড় নৌকা দেখে আমরা বাস থেকে নেমে পড়লাম। তবে কথা বলে জানা গেল এসব নৌকা আমাদের জন্য নয়। সবগুলো নৌকা বিভিন্ন স্থান থেকে এ জায়গায় আনন্দ ভ্রমণে এসেছে।

তবুও হতাশ হইনি আমরা। নদী এখন ভরা যৌবনা। কিছু একটা তো পাবই। তাই সবাই মিলে সামনের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। অবশেষে রহমানের অশেষ কৃপায় একটু পরে আমারই প্রথম চোখে পড়ল, সামনেই একটি নৌকা নোঙর করা আছে। নৌকাটাই এমন যেখানে ৮ থেকে ১০ জন ভ্রমণকারি স্বস্তির সাথে অনায়াসে ঘুরে বেড়াতে পারবেন। মনে পড়ল হৈমন্তি গল্পের অপুর সেই কথা ‘আমি পাইলাম আমি ইহাকে পাইলাম…।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিক্ষক নাজমুল হক শিকদার শিবলু, পর্দার অন্তরালের বুদ্ধিজীবী আইন বিভাগের শিক্ষক জিয়াউর রহমান মুন্সি, ফার্মাসি বিভাগের শিক্ষক কথাবন্ধু, নিরন্তর গল্পবাজ রেজাউল করিম, আইন বিভাগের আলস্যপ্রিয় অবিবাহিত শিক্ষক তাসনিম ফেরদৌস, সাঁতার না জানা (বাড়ি যদিও বরিশাল) সিএসই বিভাগের নবীন শিক্ষক আবির এবং আমি নৌকায় গিয়ে বসলাম। আর ভ্রমণ উদ্যোক্তা আইন বিভাগের শিক্ষক আবদুল্লাহ হিল গণি এবং সিএসই বিভাগের সদাহাস্য শিক্ষক আলী হুসাইন নাশতা নিয়ে আসার জন্য গেলেন। একটু পরেই আসল হারিয়ে যাওয়ার সেই মাহেন্দ্র ক্ষণটি।

নৌবিহার শুরু হলো। সেই সাথে ক্ষণিকের ধুম বৃষ্টি। নৌকা চলছে ধীর, মাঝারি লয়ে। বড় বড় বৃষ্টির ফোটা পড়ার অদ্ভুত শব্দ। সে সময়ের সে সুখটুকু আমার বলা অথবা লেখার ভাষার প্রকাশ অতীত। এ এক অনিন্দ্য সুন্দর ভাষাহীন স্বর্গীয় সুখ। মনে পড়ল মহান রবের সেই সুমধুর বাণী, ‘তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?’। আর সক্রেটিসের সেই কথা, ‘নিজেকে জানো’।

দেখতে দেখতেই আপেক্ষিক তত্ত্বের সূত্র ধরে আধাঘন্টা কেটে গেল। এরই মাঝে চলল চানামুড়ি, পটেটো চিপস আর স্প্রাইট খাওয়া। সেই সাথে চলল শিবলু স্যার আর আমার অবিরাম সেলফি ক্লিক। আর রেজা স্যারের নোকিয়া ৩১০ মডেলের মোবাইল দিয়ে যেটুকু স্মৃতি ধরে রাখা যায় তার কসরৎ। এরই মাঝে পৌছে গেলাম সাদুল্যাপুর। ঢাকার পাশেই সবুজে মোড়ানো নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে সজ্জ্বিত একটি ইউনিয়ন।

সেখানে চলার পথে টেম্পু, ভটভটি আর ব্যাটারি চালিত রিকসাই ভরসা। অবশেসে লক্কর ঝক্কর একটা ভটভটি নিয়ে পৌছে গেলাম গোলাপ বাগানে, গোলাপের সাম্রাজ্যে। দৃষ্টির সর্বোচ্চ সীমা যতদূরে দেখা যায় শুধু গোলাপ বাগান। অসংখ্য ফুটন্ত গোলাপ। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম ‘সুন্দর’, সুন্দর হল সে। এ সৌন্দর্য বিমূর্ত। ভাষায় প্রকাশহীন। এখানে ফুলেই জীবন, ফুলেই সৌন্দর্য। অসংখ্য কাঁটা মাড়িয়ে গোলাপচাষীরা নিরন্তর ফুল তুলে যাচ্ছেন। ‘কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে…। এ শিক্ষাটা মনের মাঝে আবারো উঁকি দিয়ে গেল। গোলাপ সেলফি তোলা শেষে সোয়া পাঁচটা নাগাদ এখান থেকে বিদায় নিলাম।

অজস্র গোলাপের মাঝে লেখক
অজস্র গোলাপের মাঝে লেখক

সাদুল্যাপুর ঘাটে এসে সবাই মিলে নামায এবং চা পর্ব সেরে নিলাম। চায়ের দোকানি বয়োবৃদ্ধ চাচা বিদায়বেলায় বললেন, ’আবার আইসেন’। এটাই গ্রাম। এরপর শুরু হলো নৌবিহারের দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ধাপ। টানা একঘন্টা চলল নদীর চারদিকে ক্লান্তিহীন ভ্রমণ। সাদুল্যাপুর ঘাট থেকে আমিনবাজারের পাশ দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে চলে এলাম বেড়িবাঁধ ঘাটে। সূর্য ডোবার অপরূপ দৃশ্য, সাথে হিমেল বাতাস। এর মাঝেই মাগরিবের আযানের ধ্বনি ভেসে এলো, তোমরা কল্যাণের দিকে এসো, তোমরা কল্যাণের দিকে এসো।

মো. মামুন উদ্দীন
প্রভাষক, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ
মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

About Muhammad Faisal

Muhammad Faisal
একরাশ স্বপ্ন মুঠোয় করে হাটছি অবিরাম..........

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *