Home / অন্যান্য / সাক্ষাৎকার / মুখোমুখি তারেক মাসুদ ও আব্বাস কিয়ারোস্তামি
মুখোমুখি তারেক মাসুদ ও আব্বাস কিয়ারোস্তামি

মুখোমুখি তারেক মাসুদ ও আব্বাস কিয়ারোস্তামি

তারেক মাসুদঃ আপনার প্রথম নির্মাণ ব্রেড অ্যান্ড অ্যালি থেকে শুরু করে অতি সাম্প্রতিক অববদ্য সৃষ্টি টেন পর্যন্ত এক দীর্ঘ সময় ধরে আমি আপনার ছবির একজন অনুরাগী। আপনার চলচ্চিত্রের বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত কিছু পর্যবেক্ষণ আছে। এ ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া ও মতামত জানতে চাই।

 

আপনি এবং সত্যজিৎ রায়— দুজনেই পেশগত জীবন শুরু করেন বিজ্ঞাপনী সংস্থার গ্রাফিক শিল্পী হিসেবে, এটা আমাকে যথেষ্ট কৌতুহলী করেছে। আপনার আগের ছবিগুলো, বিশেষ করে দ্য ট্রাভেলার পর্যন্ত আপনার স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবিগুলোতে রায়ের মতোই এক ধরনের গ্রাফিক গ্রাফিক নিয়ন্ত্রণ লক্ষ্য করা যায়। এই গ্রাফিক নির্মাণ বিন্যাস আপনার কম্পোজিশন, শট ডিভিশন, সঙ্গীত ও শব্দের প্রয়োগে দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে লক্ষ্য করেছি, গ্রাফিক কাঠামো ত্যাগ করে ক্রমশ আরও স্বাধীন ও খেয়ালি ধারার দিকে এগিয়েছেন। জানি না আপনি একমত হবেন কিনা, তবে চলচ্চিত্রের নিয়ম ও ব্যাকরণের কঠোর অনুসরণের পর্বটিকে ‘শরিয়তি’ এবং পরের চলচ্চিত্র ভাষার ব্যবহারে আরও স্বতঃস্ফূর্ত ও বিমূর্ত পর্বটিকে আমি ‘সুফি’ পর্ব বলতে চাই। সুফি ভাষায় বললে, ‘জাহিরি’ সিনেমা থেকে ‘বাতেনি’ সিনেমার দিকে আপনার যাত্রা আমরা দেখেছি। এসব পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে চাই।

 

আব্বাস কিয়ারোস্তামিঃ আমি আর কী বলব? আপনার এত চমৎকার বক্তব্যের পর আর কিছু বলার থাকে না। ইউরোপের সমালোচেকরা কেউই এভাবে কখনো ব্যাখ্যা করেননি। আমার প্রথম দিকের কাজের গ্রাফিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে কেউ কিছুই বলে না। দ্বিতীয় পর্ব সম্পর্কে আপনি যা বললেন, তা আশা করি প্রশংসাসূচক অর্থেই বলেছেন। যেসব পরিবর্তনের দিকে আমি এগিয়েছি, আমার মনে হয় তা খুবই স্বাভাবিক জীবনের অংশ। জীবনের কোনো একটা পর্বে আপনি নিশ্চলভাবে আটকে থাকতে পারেন না। আপনাকে এগিয়ে যেতেই হয়। আমার মতে, জীবনের গূঢ় বাঁকগুলো বয়সের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হতে শুরু করে। আমরা অবিরতভাবে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, সেই সঙ্গে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিকশিত হচ্ছে।

 

তারেক মাসুদঃ আমার মতে, আপনি শট বিভাজনের চলচ্চিত্রিক বিন্যাসরীতি ভেঙে একটা নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন। উচ্চকিত ঘোষণা ছাড়াই, শিশুসুলভ সরলতা নিয়ে আপনি একরকম সবার অজ্ঞাতেই এই কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন। জ্যঁ-লুক গোদারের মতো চলচ্চিত্রের ইউরোপীয় ক’জন মৌলিক নির্মাতা চলচ্চিত্র ভাষার প্রায় নাটকীয় পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। কিন্তু তারা এমনটি করেছেন বুদ্ধিবৃত্তিক তাত্ত্বিকতার মাধ্যমে, বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে। কিন্তু খেলতে খেলতে একটি শিশু যেমন খেলনা ভেঙে ফেলে, আপনি করেছেন সেভাবে।

 

আব্বাস কিয়ারোস্তামিঃ আপনার কথা শুনে সত্যিই ভালো লাগছে। কথাগুলো আমার ছবি সম্পর্কে বলে নয়, বরং গড়া আর ভাঙার এই ধারণাটা আমার পছন্দ হয়েছে। কিন্তু, আমি মনে করি না এটা আমার ছবির কৃতিত্ব; বরং আপনিই আমার ছবিগুলো এভাবে দেখেছেন। আমি শুধু শিশুদের সম্পর্কে একটি চমৎকার কথা বলব। এটা আমার কথা নয়, একজন আরব দার্শনিকের। শিশুদের তিনি ভালোবাসতেন, কারণ শিশুরা কিছু তৈরি করার পর তা ভেঙে ফেলে। তারা নতুন কাপড় পরে খুশি হয়– তারপর সেটা নোংরাও করে ফেলে। কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য বা কৌশল না ভেবেই নিজেদের মধ্যে বিবাদ তৈরি করে। আমার মনে হয়, বিশেষ করে আপনার শেষ কথায় আপনি ঠিক এটাই বোঝাতে চাইছেন। কারণ, আমি মনে করি পরিকল্পনা করে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন নেই। এটা খুবই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটবে। মনের খুব গভীরে ডুবে গিয়ে নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করা দরকার। একটা সত্যিকারের বোঝাপড়া যদি হয়, তো ভাঙা খুবই সহজ-স্বাভাবিক। কারণ, নিজের নির্মাণ নিজে আঁকড়ে থাকার মানে হয় না। নির্মাতার গর্ব নিয়ে, নিজের নির্মাণের মধ্যে আটকে থাকা কেন!

 

তারেক মাসুদঃ আমার মতে, আপনার ছবি ‘আধুনিক’ সিনেমা ও তার কাঠামো বিষয়ে প্রথাগত ধারণাকেই শুধু নয়, সেই সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক ‘অথর’ সিনেমাকেও বাতিল করেছে। একজন ‘অথর’ পরিচালক ধরে নেন যে, দর্শকের যেহেতু বোঝার সামর্থ্য নেই, তাই তাকে কিছু বোঝাতে হলে মুখে চামচ তুলে খাইয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে আপনার মাঝে খুঁজে পাই এক দার্শনিক-চলচ্চিত্র নির্মাতাকে। দর্শন মানে আমি বলতে চাচ্ছি– এক সুসংহত ধারাবাহিক জীবনদৃষ্টির কথা। ওজু এবং ব্রেসোঁর মতো মহান স্রষ্টাদের পর থেকে সমসাময়িক চলচ্চিত্রে এই দার্শনিক দিকটির অভাব আমি বোধ করেছি। তাই তাদের কাজকে আমি পছন্দ করি এবং একই কারণে পছন্দ করি আপনার কাজকেও।

 

টেস্ট অফ চেরি । ফিল্মমেকার : আব্বাস কিয়ারোস্তামি

 

আব্বাস কিয়ারোস্তামিঃ আপনার বক্তব্যের অনুষঙ্গ হতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান লাগছে। আপনি যে ধারাটির ইঙ্গিত করেছেন, সেটাই শিল্প-সাহিত্যের মূল মোক্ষ। এ ধরনের শিল্পকর্ম গড়েপিটে নয়, বরং ভেঙেচুরে সৃষ্টি করতে হয়। উৎসে ফিরে যাওয়া বা শৈশবে প্রত্যাগমন বলতে ঠিক এটাকেই বোঝায়। শিল্পের জন্য জ্ঞানের সত্যিই কোনো দরকার নেই। শিল্পকে কোনো পুঁথিনির্ভর দর্শনও হয়ে উঠতে হয় না। দর্শন নিজের ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসবে। নিজেকেই হতে হবে এর উৎস। আমার তো জানতে কৌতুহল হচ্ছে– চলচ্চিত্র নির্মাতা হওয়ার আগের আপনার সম্পর্কে।

 

তারেক মাসুদঃ বেশির ভাগ মধ্যবিত্ত শিশুদের মতো নিয়মিত স্কুলে আমি যাইনি। আমাকে পাঠানো হয় মাদ্রাসায়। সেখানে জীবন্ত প্রাণীর ছবি আঁকা নিষিদ্ধ ছিল। একদিনের কথা আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, আরবি হস্তলিপির ক্লাসে নিজের আরবি স্বাক্ষরের মধ্যে লুকিয়ে একটি প্রজাপতি আঁকছিলাম। আমার শিক্ষক পেছন থেকে এসে আমার কাঁধে হাত রাখেন। জিজ্ঞেস করেন, ‘কেন এটা আঁকা নিষেধ করা হয়েছে, তা কি তুমি জানো? কারণ, এতে তুমি প্রাণ দিতে পারবে না। একমাত্র আল্লাহ তা পারেন।’
আপাতবিরোধী হলেও এমন একটা পটভূমি থেকেই আমি চলচ্চিত্রকার হয়েছি। জীবিত প্রাণীর প্রতিমূর্তি পুনরুৎপাদন করাই আমার কাজ। কিন্তু এখন অতীতের দিকে তাকালে আমার শিক্ষকের কথার বৃহত্তর সত্যের একটি উপাদান দেখতে পাই– বিশেষ করে চলচ্চিত্র নির্মাণের দিক থেকে। কারণ, আমরা নির্মাতারা জীবন্ত প্রতিমূর্তির পুনর্নির্মাণ করার চেষ্টা করি। কিন্তু সেই প্রতিমূর্তিতে প্রাণ জাগাতে প্রয়োজন হয় এক ধরনের ঐশ্বর্য্য, সিনেমার মহান নির্মাতাদের অধিকারে সেই ক্ষমতা ছিল। এই ইমেজ ও পুনর্নির্মিত ইমেজের মধ্যকার সম্পর্ক বা অন্যভাবে বললে, জীবন ও চলচ্চিত্রের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়েও আমি কথা বলতে চাই– যা আপনার অনেক ছবিরই বিষয়।

 

আব্বাস কিয়ারোস্তামিঃ পরস্পরের জন্য আরও অর্থবহ একটি আলোচনার জন্য আমার মনে হচ্ছে, আমাদের দুজনেরই অপরের ছবিগুলো দেখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। দুঃখের বিষয় যে, আপনি আমার সব ছবি দেখলেও, আমি আপনার একটি ছবিও দেখিনি। আমি আপনার ছবি দেখতে এবং পরস্পরের ছবি নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী। আপনি কীভাবে নির্দিষ্ট একটি ইমেজ পেলেন, আপনার ধারণাগুলো কোত্থেকে আসে, আপনার মন থেকে কীভাবে তা নিঃসরিত হচ্ছে কিংবা নানাধরনের ঘটনা থেকে কী-বা আপনার মধ্যে ঢুকে আপনাকে কীভাবে বদলে দিচ্ছে! আপনার ছবি আপনাকে কীভাবে বদলে দিচ্ছে। একটা ভালো কাজের পর এটাই মুখ্য বিষয় বলে আমার মনে হয়। এই বদলে যাওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
এমনটা নয় যে, পরের ছবিতেও আপনাকে একই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এমনই নয় যে, আপনি একই জিনিস আবার শুরু করতে যাচ্ছেন। আপনি নিজে যতটা পরিণত হয়ে উঠছেন, আপনার দ্বিতীয় ছবিটা হয়তো সেদিকে গেলই না। আপনি ভাবলেন, নিজের সঙ্গে আপনার ছবির ব্যবধান বোধহয় ক্রমশ বাড়ছে। আপনি যা বলতে চাইছিলেন, তার কিছুই বলা হলো না; আর ছবিতে যা দেখলেন, তা আপনার নয়। আমার মনে হয়, চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মনোহর ঘটনা এটাই। আমার ধারণা, আপনি এ ধরনের অভিজ্ঞতার যোগ্য ব্যক্তি।
যখন আমি বলি, আমার ছবির দৃশ্যগুলো পূর্বপরিকল্পিত নয়, অন্যরা ধরে নেয়, আমি কিছুই করিনি। কিন্তু আমার কথার অর্থ সেটা নয়। অর্থটা আপনি ধরতে পারছেন। আমি সত্যিই যথেষ্ট সময় নিয়ে আপনার ছবিগুলো দেখার এবং সেগুলো নিয়ে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করছি।

 

মাটির ময়না । ফিল্মমেকার : তারেক মাসুদ

 

তারেক মাসুদঃ আপনাকে আমার ছবি দেখাতে পারলে আমি নিজেও সম্মানিত বোধ করব। কিন্তু আমার ছবির কথা বলে আপনার সময় নষ্ট না করে বরং আরেকটি বিষয়ে প্রশ্ন করতে চাই।

 

আব্বাস কিয়ারোস্তামিঃ আপনার প্রশ্নগুলোকে আমার প্রশ্ন মনে হচ্ছে না; কারণ, আমি কোনো উত্তর দিইনি। আপনিও বোঝেন যে, কিছু প্রশ্নের উত্তর হয় না। উত্তর প্রশ্নের ভেতরই রয়ে যায়।

 

তারেক মাসুদঃ আসলে আমি এই বিষয়গুলোকে পর্যবেক্ষণ হিসেবেই আপনার কাছে তুলে ধরতে চাইছিলাম। আপনার প্রতিক্রিয়া আর মন্তব্যের মাধ্যমে এদের যথার্থতা সম্পর্কে নিজেকে আশ্বস্ত করতে চাইছিলাম। ইরানের সুফিবাদের প্রভাবপুষ্ট বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতিতে বড় হয়েছি আমি। মাদ্রাসার ছাত্র হিসেবে ইরানের সুফিকাব্যও আমি পড়েছি। এসব কারণে ইরানি সংস্কৃতির প্রতি সবসময়ই আমার এক গভীর আগ্রহ রয়েছে। আমি সবসময়ই বুঝতে চাইতাম, আপনার চলচ্চিত্র ভাষার প্রেরণা হিসেবে এই সংস্কৃতির ভূমিকা কতটা, আর চলচ্চিত্রের প্রতি আপনার মনোভাব, পাশ্চাত্য সিনেমায় আপনার শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার দ্বারা কতটা প্রভাবিত হয়েছে।

 

আব্বাস কিয়ারোস্তামিঃ আমার মনে হয়, এটা ভেতর থেকেই আসে। বাইরের যেটুকু তা কেবল আপনার নিজস্ব ভাবনার প্রতি আস্থাটুকু আরও বাড়িয়ে দেয়। আপনার মাদ্রাসায় বিদ্যালাভের মতোই আনুষ্ঠানিক শিক্ষা-দীক্ষার তুলনায় ভেতরের আবেগ-অনুভূতি আমাদের অনেক গভীরে নিয়ে যায়।

 

তারেক মাসুদঃ আমি বোধ করি, আপনার চলচ্চিত্র ভাষার ভিত্তি রয়েছে ইরানের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের গভীরে। বিশেষত সুফি সাহিত্যের রূপকাশ্রয়ী ধরন আপনার ছবিতে বিদ্যমান। আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই যে, বাংলাদেশেও ইরানের সুফিকাব্য দ্বারা প্রভাবিত এক সমৃদ্ধ মৌখিক মরমি ঐতিহ্য বিরাজমান। ‘বাউল’ হিসেবে এই ধারা পরিচিত। এর অনুসারীরা সমাজের মূল ধারার বাইরে বিরাজ করেন। তারা সূক্ষ্মতার সঙ্গে ও রূপক ঢঙে মরমি গানের মাধ্যমে সমাজের প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে পরোক্ষভাবে সমালোচনা করে থাকেন। যদিও শরিয়তের কড়া বিধান অনুযায়ী সঙ্গীত নিষিদ্ধ, তবুও তারা আল্লাহর প্রতি তাদের প্রেমকে এসব গানেই নিবেদন করেন। এ এক ধরনের শৈল্পিক প্রতিবাদ। আমি আপনার এবং অন্য ইরানি ছবি ঢঙের সঙ্গে বাংলার ‘বাউল’ সংস্কৃতির সাদৃশ্য দেখতে পাই। আপনার দেশীয় ঐহিত্যে শিকড়গাড়া এই চলচ্চিত্র ভাষা, আর চলচ্চিত্রে আপনার প্রাথমিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা– যার বেশির ভাগটাই পশ্চিমা– এই দুটোর বিরোধিতা কীভাবে কাজ করে?

 

আব্বাস কিয়ারোস্তামিঃ আমার প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি করতে গিয়ে আমি মহাসমস্যায় পড়লাম। সবাই আশা করছিল, আমি চলচ্চিত্রের আইনকানুন ও তার প্রায়োগিক রীতিনীতি মেনেই কাজ করব। চলচ্চিত্র সমালোচকরা বললেন, আমি যা তৈরি করেছি সেটা আসলে সিনেমা হয়নি। আমি জানি না, কেন! তারা বললেন, সিনেমার নিয়মের মধ্যে এটা পড়ে না। সবকিছু যেন সেই ‘মাদ্রাসা’ থেকে বেরিয়ে আসছিল। কারণ, সেটাই প্রত্যেকের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বর্ণ সময়– যে কথা আপনি খুব সুন্দরভাবে বলেছেন। যখন আমি মাদ্রাসায়, অর্থাৎ, আমাদের স্কুলে পড়তাম, তখন আমার শহরে এমনকি সিনেমা হলও ছিল না। বারো বছর বয়সে আমি প্রথম সিনেমা দেখি। পর্দায় আমার দেখা প্রথম ইমেজ ছিল এমজিএমের সিংহটি। আমি ভয়ে আমার বোনের হাত ধরে রেখেছিলাম। কিন্তু তারপর, ছবির অর্ধেকের আগেই আমি ঘুম।যখন ছবি শুরু হয়েছিল, জীবনের প্রথম আমি ইমেজগুলো দেখছিলাম– সেই প্রথম মুহূর্তগুলো আমার মধ্যে অত্যন্ত গভীর ছাপ রেখে গিয়েছিল। এমনকি এখনো প্রথাগত সিনেমা আমার কাছে প্রায় একই রকম। এই কান উৎসবে একটি ছবি সত্যিই আমাকে নাড়া দিয়েছে। ভারতের একটা স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি, অ্যা ভেরি ভেরি সাইলেন্ট ফিল্ম [মণীষ ঝা; ২০০২]। খুবই সহজ-সরল ছবি এটা এবং সিনেমার নিয়ম-কানুনের বাইরে।

 

যে কোনো যন্ত্রের মতোই ক্যামেরা কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম আর লিখিত নির্দেশনা নিয়ে আসে। ইমেজ আমার কাছে শব্দের মতো। কোনো নিয়ম নেই; কোনো নিয়ম মেনে একের পর এক জিনিস সাজিয়ে যেতে হবে কেন? এই বিন্যাস ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের অসংখ্য জনপ্রিয় বক্তা আছেন, কিন্তু আমাদের কবিও আছেন। তারা একে অপরের চাইতে অনেক ভিন্ন। একজন বক্তা যেমন কবি নন, একজন কবিও নন বক্তা। সুতরাং, যদি প্রশ্ন করেন, শিল্প কোত্থেকে আসে? এটা আসে জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে। যে জীবনের ভেতর দিয়ে আমরা প্রবাহিত হচ্ছি। সবকিছুই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আসে। অভিজ্ঞতা আমাদেরকে সাফল্য নাও দিতে পারে। কিন্তু তা যদি শেখায় নিয়ম না মানতে, সেটাই অনেক। এভাবেই সুযোগ তৈরি হয়, ঈশ্বরের দিকে খুলে যায় আরও একটি জানালা।

▓ সৌজন্যেঃ তারেক মাসুদ ▓
সূত্রঃ তারেক মাসুদ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট

About Muhammad Faisal

Muhammad Faisal
একরাশ স্বপ্ন মুঠোয় করে হাটছি অবিরাম..........

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *