Home / কেরিয়ার / আত্মকর্মসংস্থান / স্বল্প পুঁজিতে বৃহৎ সম্ভাবনা
স্বল্প পুঁজিতে বৃহৎ সম্ভাবনা

স্বল্প পুঁজিতে বৃহৎ সম্ভাবনা

বর্তমান সময়ে কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাওয়া অনেকটাই অনিশ্চত।কাজের পরিবেশ, ভালো সম্মানী-নানা টানাপোড়েনে প্রাণ ওষ্ঠাগত। অথচ আশেপাশে ছড়িয়ে আছে নানা উপকরণ। কৌশল আর মেধার সমন্বয়ে ক্ষুদ্র উদ্যেগে গড়ে তুলতে পারেন সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত।

লিখেছেন- মোঃ মনিরুজ্জামান।

 

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। দেশে বেকারত্বের হার ঠিক এমনই একটি সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে সরকারের পাশাপাশি দেশের যুব সম্প্রদায়কেও উদ্যোগী হতে হবে এবং সে লক্ষ্যেই দেশে বর্তমানে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্র উদ্যোগে হলেও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। যার মাধ্যমে সহজেই বেকারত্বের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসা যায়। খুব বেশী জনবলের প্রয়োজন হয় না বলে বসত বাড়িতেই এ ধরনের ক্ষুদ্র শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এভাবে যে পণ্য সামগ্রী তৈরি করা যায় সেগুলো হলো- মশা নিধনে কয়েল, মোমবাতি, চানাচুর, মুড়ি, চক, সাবান, বলপেন, জুস, চিপস, সেমাই, নুডলস, বিস্কুট, পাউরুটি ইত্যাদি।

 

মশা নিধনে কয়েল

কয়েল তৈরিতে প্রয়োজন হয় এস বায়োথ্রিন, কাঠের ভূসি, সিমন্ড, বার্লি, বেনজিক, ধূপ, সুগন্ধি এবং রং। প্রথমে সব উপকরণ পানি দিয়ে মিশিয়ে মন্ড তৈরি করে নিতে হবে। তারপর মন্ড মেশিনের সাহায্যে রুটির মতো করে বানিয়ে কয়েলের সাইজ অনুসারে কাটিং মেশিন দিয়ে কেটে নিন। কাটার পর রোদে শুকাতে দিন। লক্ষ্য রাখবেন যেন ভেজা না থাকে। শুকানোর পর আকর্ষণীয় মোড়কে বাজারজাত করুন কয়েল তৈরির জন্য একটি মেশিনের দাম ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। কাঁচামাল ও অন্যান্য আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্র নিয়ে শুরু করতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাগবে।
সাধারণত একটি মেশিনের বিপরীতে একজন শ্রমিকই যথেষ্ট তারপরও অধিক হারে উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে দুই থেকে তিন জন লোক নিয়োগ দিতে পারেন।একটি মেশিন থেকে দৈনিক যে পরিমাণ কয়েল তৈরি হবে সেগুলো বাজারজাত করে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ লাভ হতে পারে।

 

মোমবাতি

মোমবাতি তৈরির মৌলিক উপাদান হলো পেরাফিন ষ্টিয়ারিক এসিড, রং এবং সুতা। পেরাফিন দুই প্রকার। হার্ড পেরাফিন এবং সেমি পেরাফিন। মোম তৈরিতে সাধারণত হার্ড পেরাফিন ব্যবহৃত হয়। ষ্টিয়ারিক এসিড গন্ধহীন সাদা এসিড। এটি মোমকে শক্ত ও বাতাসে জ্বলতে সহযোগিতা করে। ষ্টিয়ারিক এসিড আবার দুই প্রকার। যেমন-রাবারে ব্যবহৃতু ষ্টিয়ারিক এসিড ও মোমে ব্যবহৃত ষ্টিয়ারিক এসিড। তবে আজকাল অনেকেই শুধুমাত্র পেরাফিন দিয়েই মোম তৈরি করছে যার ফলে মোম খুব কম সময় জ্বলে। মোমে পাউডার জাতীয় রং ব্যবহার করাই ভালো। প্রয়োজনীয় সব উপকরণ ড্রামে ঢেলে তাপ দিতে হবে। তারপর পর্যায়ক্রমে ষ্টিয়ারিক এসিড, সুতা ও রং ব্যবহার করতে হবে। মোমবাতির ব্যাসের উপর সুতা চিকন, মোটা হতে পারে। মোমের ছাঁচ নির্ভর করবে এর আকারের উপর। সাধারণত একই ছাঁচে ২-৩ ধরনের মোম তৈরি করা যায়। মোমবাতির তেরিতে যেসব যন্ত্রপাতির প্রয়োজন সেগুলো হলো টিন বা ষ্টিলের ড্রাম, টিনের মগ, সুতা কাটার জন্য কাঁচি গ্যাস বার্ণার, কাগজ, ডাইম বা ছাঁচ। মোমবাতি তৈরির জন্য একটি উন্নতমানের সেমি অটো মেশিনের দাম পড়বে ৭৫,০০০ টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি ডজন মোমবাতি বিক্রি করে ৩-৪ টাকা লাভ থাকবে।

 

চানাচুর

স্বল্প কিংবা বৃহৎ উভয় প্রকার পুঁজি বিনিয়োগ করে এ ব্যবসা শুরু করা যায়। চানাচুরের চাহিদা থাকায় এবং ঝামেলাহীন লাভজনক বলে অল্প দিনেই এ ব্যবসায় সফলতা অর্জন করা যায়। চানাচুর তৈরির মূল উপকরণ হলো-ময়দা, খেসারির ডাল, বেসন, চিড়া, ডাবলী, বাদাম, মসলা, হলুদ, ও মরিচের গুঁড়া, লবন , তেল
এ্যামোনিয়া এবং হাইডোস। এছাড়াও যেসব যন্ত্রপাতি লাগবে সেগুলো হলো কড়াই, ডাইস, ট্রে, হামান দিস্তা, গামলা, জগ, বালতি, খুন্তি এবং ডালা। উপকরন সংখ্যা বা পরিমাণ ব্যবসার উপর নির্ভর করবে। ব্যবসা যত বড় হবে তত বেশি উপকরণ লাগবে। চানাচুর তৈরির মেশিনের দাম পড়বে ৫০-৬০ হাজার টাকা। প্রতি কেজি চানাচুরের উৎপাদন খরচ পড়বে ৩০-৩৫ টাকা, যা পাইকারী দরে বাজারে বিক্রি করা যাবে ৫০-৬০ টাকা।

 

মুড়ি

আমাদের দেশে বছর জুড়ে মুড়ির চাহিদা থাকলেও রমজান মাসে এর চাহিদা বেড়ে যায়। বর্তমানে মুড়ি তৈরির কারখানা খুবই সীমিত। স্বল্প পরিসরে মুড়ির ব্যবসায় অনেক লাভবান হওয়া যায়। মুড়ি তৈরির জন্য জেভিই পাওয়ার নরমাল মেশিনের দাম প্রায় ৭০ হাজার টাকা এবং অটোমেটিক মেশিনের দাম ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। ব্যবসাটি লাভজনক বিধায় যে কেউ যে কোনো জায়গায় মুড়ি তৈরির কারখানা গড়ে তুলতে পারেন।মুড়ি তৈরির মেশেন স্থাপনে প্রয়োজন হবে ৩০০-৪০০ স্কয়ার ফুট জায়গা। মেশিনটি ক্রয়ের পূর্বে অবশ্যই ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে পরামর্শ করে নিতে হবে। মুড়ির ব্যবসায় কি পরিমাণ লাভ হবে তা বের করা যায় এভাবে- চাল ১০০ কেজি ৩,৫০০-৪,৫০০ টাকা। ১০০ কেজি চালে মুড়ি হবে ৯৫ কেজি। এর বাজার দর প্রায় ৬,০০০-৭,০০০ টাকা। সুতরাং বুঝতেই পাড়ছেন বিনিয়োগ অনুসারে লাভ কেমন? স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদন যত বাড়বে সে অনুপাতে লাভের অংকটাও বাড়বে।

 

চিপস্

মখরোচক খাবার হিসেবে শিশু, তরুণ, এমনকি বৃদ্ধদেরও চিপস্ পছন্দ। তাই চিপস্ তৈরির কৌশল ভালোভাবে আয়ত্ত করতে পারলে এখান থেকেও ভালো অংকের মুনাফা লাভ করা সম্ভব। চিপস্ তৈরির জন্য কয়েক প্রকার মেশিন রয়েছে। যেমন-হাতে তৈরির মেশিনের মূল্য ৮ হাজার টাকা, ষ্টেইনলেস ষ্টিল মেশিনের মূল্য ১৫ হাজার টাকা এবং অটো মেশিনের মূল্য ৩০ হাজার টাকা। সাধারণত এটি মটরের সাহায্যে চলে। এই মেশিনের সাহায্যে ঘরে বসেই বাজারের চাহিদানুযায়ী পটেটো অথবা চিকেন চিপস্ বানাতে পারেন। পটেটো চিপস তৈরি করতে হলে প্রথমে আলু ছিলতে হবে। তারপর গরম পানিতে সেদ্ধ করতে হবে। এরপর সেদ্ধ আলু মেশিনের সাহায্যে কেটে ট্রে ড্রায়ারে রেখে ৮-১০ ঘন্টা শুকাতে হবে। এবার এগুলোকে প্যাকেট করলেই কাজ শেষ। প্রতিটি ৬ টাকা দামের চিপসের প্যাকেট প্রতি খরচ ৩ টাকা। পাইকারী মূল্য প্যাকেট প্রতি ৫ টাকা হরে প্রতি প্যাকেট থেকে লাভ হবে ২ টাকা।

 

লাগবে ট্রেড লাইসেন্স

ব্যবসা করতে হলে বৈধ কাগজপত্র লাগবে এ তো জানা কথা। ট্রেড লাইসেন্স এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনার জায়গাটি যদি ভাড়া হয় সেক্ষেত্রে মালিকের সঙ্গে করা চুক্তিপত্রের ফটোকপি, দুই কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবিসহ আবেদনপত্র জমা দিতে হবে। নিকটস্থ পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ অফিসে। নির্দিষ্ট ফি’র বিনিময়ে সেখান থেকে ট্রেড লাইসেন্স পাবেন আপনি। যা প্রমাণ করবে আপনি একজন বৈধ ব্যবসায়ী।

 

শিল্প স্থাপনে যন্ত্রপতি

ক্ষুদ্র শিল্প কারখানা শুরু করার পূর্বে অনেকেরই ভাবনা থাকে কোথাথেকে কীভাবে উপকরণ সংগ্রহ করবেন। এসব উপকরণ সংগ্রহের জন্য রাজধানীর মিটফোর্ড ও চকবাজার বিখ্যাত। এখানে উপরে উল্লেখিত সকল শিল্পের উপকরণ পাওয়া যায়।এছাড়াও রাজধানীতে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা যে কোনো শিল্পের যন্ত্রপাতি বা কারখানা স্থাপন ও তার সামগ্রিক পরিচর্যার দায়িত্ব নিয়ে থাকে এবং বিশেষ শর্তসাপেক্ষে মেশিনারিজ সরবরাহ করার পাশাপাশি দিয়ে থাকে নিশ্চয়তাও। আপনি ইচ্ছা করলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন।

 

বলপেন

সাধারণত তিনটি মেশিনের সমন্বয়ে বলপেন তৈরি হয়। মেশিন তিনটি হচ্ছে ইংক ফিলিং মেশিন, টিপস সেটিং মেশিন এব সেন্ট্রিফিউং মেশিন। ইংক ফিলিং মেশিনের মাধ্যমে ওয়ান টাইম কলমে কালি ঢোকানো হয়। টিপস সেটিং মেশিনের মাধ্যমে ওয়ান টাইম বলপেন বডিতে টিপস ফিটিং করা হয় এবং সেন্ট্রিফিউং মেশিনে কম্প্রেশিং করা হয়।কালি টিপস ফিটিং করার পর বাতাস বের করার জন্য এই কাজটি করতে হয়। ফলে লেখা সুন্দর ও মসৃণ হয়। বলপেন তৈরির জন্য সেমি অটো মেশিনের দাম পড়বে ৫০-৬০ হাজার টাকা। এক সেট মেশিনের জন্য ৬ ফুট বাই ৩ ফুট টেবিলের প্রয়োজন। ২ জন শ্রমিক ১২ ঘন্টায় ৫০ গ্লোস কলম তৈরি করতে পারে। ৫ টাকা মূল্যের প্রতি গ্লোস তৈরিতে খরচ পড়বে ২৮৫-৩০০ টাকা। যা অনায়াসে ন্যূনতম ৪৫০ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব।

About Muhammad Faisal

Muhammad Faisal
একরাশ স্বপ্ন মুঠোয় করে হাটছি অবিরাম..........

Check Also

ফ্রিল্যান্স কাজ ঘরে বসে বাড়তি আয় ৭ম পর্ব

ফ্রিল্যান্স কাজ | ঘরে বসে বাড়তি আয় (৭ম পর্ব)

বিশ্বায়নের এই যুগে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এদেশেও ফ্রিল্যান্স কাজের অনেক ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে। এখন …

6 comments

  1. মুরি তৈরি জেভিই পাওয়ার নরমাল মেসিনের জন্য কোথায় যোগাযোগ করব

  2. আমার mali এর মাধ্যমে যদি আপনার যোগাযোগের ঠিকানা বা মোবাইল নাম্বার দিয়ে দিতেন। তাহলে কৃতঃ থাকিব। আমি পেশায় একজন ইউনিয়ন উদ্দোক্তা

    • Muhammad Faisal

      ভাই রিংকু, দয়া করে আমার সাথে ফেসবুকে যোগাযোগ করুন। আমার ফেসবুক প্রোফাইল লিংক উপরে দেয়া আছে। ধন্যবাদ

  3. মুহাম্মাদ হুমায়ুন চৌধুরী

    মোমবাতি তৈরির কাঁচামাল যেমন : স্টিয়ারিক এসিড, পেরাফিন কোথায় পাওয়া যায়, ডাইস কোথায় তৈরি করতে হবে বললে উপকৃত হতাম; ধন্যবাদ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *